অভ্র, বিজয়, পেটেন্ট বিষয়ে

2010/04/24 at 9:43 অপরাহ্ন (বিভাগবিহীন)

শিরোনামঃ অভ্র, বিজয়, পেটেন্ট বিষয়ে

লেখকঃ জ্বিনের বাদশা

সাইটের প্রকৃতিঃ সচলায়তন কমিউনিটি

সময়ঃ ২০১০-০৪-২৪ ১৮:৫৮

লিংকঃ http://www.sachalayatan.com/mukit_tohoku/31714

লেখাঃ

অভ্রবিষয়ে জনাব মোস্তফা জব্বার তাঁর অভিযোগটা ঠিক কোন জায়গায় সেটাকে একদম সরাসরি প্রকাশ করেছেন, যেজন্য তাঁকে ধন্যবাদ। এটা এখন নিশ্চিত যে অভ্র বিষয়ে তাঁর সমস্যা একটিই, সেটা হলো অভ্রতে অপশন হিসেবে ইউনিবিজয় নামে একটি লেআউটের সংযোজন হয়েছে। কেন সমস্যা বোধ করছেন সেটাও তিনি জানিয়েছেন, তিনি বলছেন, অভ্রতে ব্যবহৃত ঐ ইউনিবিজয় লেআউটটি আসলে তাঁর বাজারজাত করা এবং বছর দুয়েকের খানিক বেশী আগে পেটেন্ট করা বিজয় লেআউট। গতকাল প্রথম আলোতে ছাপা তাঁর পক্ষের বক্তব্যে এটা দাবী করা হয়েছে যে ইউনিবিজয় হলো বিজয়ের “হুবহু” বা “অবিকল” নকল!

এই “হুবহু” কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিবিজয় যদি বিজয়ের হুবহু অনুরূপ হতো তাহলে নৈতিকতা যেটাই হোক, দাবী করা যেত যে অভ্র থেকে যেন লে-আউটটি সরিয়ে ফেলা হয়।

কিন্তু অভ্রের প্রণেতা মেহদী হাসান খানের “ভাষা উন্মুক্ত হবেই” শীর্ষক পোস্টে (সচলায়তনের নীড়পাতায় স্টিকি করা আছে) জানা গেলো যে, ইউনিবিজয় লে আউটটি বিজয়ের হুবহু অনুরূপ লেআউট না, বরং মোট আটটি বাটনের ক্ষেত্রে বিজয় আর ইউনিবিজয়ের পার্থক্য আছে। মেহদী ঐ পৃথক বাটনগুলোকে চিহ্নিত করা একটি ছবিও ঐ পোস্টটিতে তুলে দিয়েছেন। মেহদীর তুলে ধরা পয়েন্টের প্রেক্ষিতেই এই পোস্টের অবতারণা। দেখার চেষ্টা করা যে পেটেন্টের ঝামেলায় ইউনিবিজয়কে মোস্তফা জব্বার ফেলতে পারেন কিনা।

পেটেন্ট আইন সম্পর্কে আমার ধারনা খুব বেশী না। আমি বরং এই পোস্টে ইউনিবিজয়কে যাতে বিজয় পেটেন্টের ভয় দেখিয়ে ঘাঁটাতে না পারে, সে বিষয়ে আইনের হাত ধরে কিভাবে বের হওয়া যায় সেসব নিয়ে আলোচনা করবো। সরাসরিই বলি, আইন কখনই চুড়ান্ত কিছুনা। আইন হলো দূর্বল কিছু নীতিমালার সমষ্টি, যেগুলো মানুষের সমাজে নীতিবোধকে টিকিয়ে রাখার জন্য, সঠিক পথে চলা মানুষকে অসতের খড়গের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ব্যবহার করা যায়। কাজেই নীতিবোধ আগে না আইন আগে সে প্রশ্নে আমার অবস্থান পরিস্কার, নীতিবোধ। সেজন্যই অভ্র টীম তাদের কাজ করে আইন মানছে কি মানছেনা এই প্রশ্নের চেয়েও যেটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো বিনামূল্যে এবং স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে কম্পিউটারে বাংলা লেখার সুযোগ করে দেয়ার অভ্রের চমৎকার প্রচেষ্টাটিকে কিভাবে দৃশ্যমান খড়গ আর প্রভাবের হাত থেকে বাঁচানো যায়, সেটার সম্ভাবনা যাচাই করা। কয়েকটা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করবো।

১। অবিকল না আলাদা লেআউট?

মূল প্রশ্ন:দুটো কী বোর্ড লেআউট যদি হুবহু অবিকল না হয়, তাহলে কি পরে ডিজাইন করা লেআউটটি আগের ডিজাইন করা লেআউটের পেটেন্ট অধিকার নষ্ট করে কিনা।
মানে, কয়টি বোতাম আলাদা হলে ভিন্ন লেআউট বলা যাবে? এর কোন উত্তর নেই, এটা নির্ভর করবে লেআউটের পেছনে টেকনিকাল অরিজিনালিটিটা কতটুকু শক্তিশালী তার ওপর।

এজন্য আসুন আমরা একটু ইতিহাসের দিকে তাকাই। ১৮৫৯ সালের নভেম্বরে জর্জ মে ফেল্পস এবং ডেভিড এডওয়ার্ড হিউজ উদ্ভাবন করেন একটি টেলিগ্রাফ প্রিন্টারের, যাতে ইংরেজী বর্ণগুলো ABC… টাইপের বর্নমালার ক্রমেই দুটো সারিতে সাজানো ছিলো, কিন্তু উপরের সারিতে বর্ণমালার প্রথম অর্ধেক (A থেকে N) সাজানো ছিলো বাঁদিক থেকে ডানের ক্রমে, আর নিচের সারিতে শেষ অর্ধেক (O থেকে Z) সাজানো ছিলো ডান থেকে বাঁয়ের ক্রমে। এই যন্ত্রের যে পেটেন্ট “ইউএস পেটেন্ট ২৬০০৩“, সেই ডকুমেন্টের ফিগার ১ এ লেআউটটি দেয়া আছে। সম্ভবতঃ বোতাম চাপার পর যে যন্ত্রের ভেতর কাজ করা ম্যাগনেটিক জ্যাম এড়াতে এই লেআউট করা হয়।

এর ৮ বছর পরে ১৮৬৭ সালের জুলাই মাসে কোয়ের্টি কী বোর্ডের জনক ক্রিস্টোফার লাথাম শোলজ তাঁর উদ্ভাবিত প্রথম টাইপরাইটারের পেটেন্ট করেন, (ইউ এস পেটেন্ট ৭৯৮৬৮)। এটিরও ফিগার ১ এ আপনি উদ্ভাবিত টাইপরাইটারটির লেআউট দেখতে পাবেন। ভালো মতো খেয়াল করলে দেখবেন, এতে নিচের সারিতে (A থেকে N) সাজানো ছিলো বাঁদিক থেকে ডানের ক্রমে, আর উপরের সারিতে (O থেকে Z) সাজানো ছিলো ডান থেকে বাঁয়ের ক্রমে। ফেল্পস/হিউজের লেআউটের সাথে শোলজের লেআউটের ব্যবধান একটিই, তা হলো বর্ণের সারিদুটোকে উপর-নীচ করে দেয়া। শোলজও এই লেআউটটি বেছে নিয়েছিলেন জ্যাম বন্ধ করতেই, তবে পরে তিনি টাইপিং, ইংরেজী ভাষায় বর্ণের বিন্যাস এরকম আরো কিছু প্যারামিটার যোগ করে তাঁর লেআউটটিকে আরো বদল করেন, যার মোটামুটি পরিপূর্ণ রূপ আমাদের আজকের ব্যবহার করা কোয়ের্টি কী-বোর্ড। প্রশ্ন আসতে পারে, শোলজ কেন ফেল্পসের লেআউটটি হুবহু ব্যবহার না করে উপর-নিচ করে বদলে দিলেন। কারণটা তিনি কোথাও উল্লেখ না করলেও, উদ্ভাবকদের দুনিয়ায় এটা অনুধাবন করতে কোন কষ্ট হয়না যে পেটেন্টের ঝামেলা এড়াতে তিনি এই সামান্য পরিবর্তন করেছেন।

এখন এই কেইসটির আলোকে আমরা বিজয়-ইউনিবিজয় নিয়ে একটু ঘেঁটে দেখি।
ফেল্পসের পেটেন্টে বর্ণের বিন্যাসের সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করার ফলেও, তিনি এই বিন্যাসের সারি দুটোকে উলট পালট করে নিলেও যে একই সুবিধা পাওয়া যাবে সেরকম কোন দাবী বা ক্লেইম পেটেন্টে করেননি। এই ক্লেইম না থাকায় তাঁর বিন্যাসের সেরকম ব্যবহারকে তাঁর পেটেন্টটি প্রতিহত করতে পারেনি। আর এদিকে মোস্তফা জব্বারের বিজয়ের ক্লেইমগুলো দেখলে দেখা যায়,

উদ্ধৃতি

“1. A new Keyboard layout to write Bongolipi characters with a QWERTY based Keyboard in a computer or any other microprocessor based device has been invented and 55 Bangla characters are placed in a unique way so that all Bangla characters (Bongolipi) can be written without any hardware modification and to make it effective pairs of Bangla charactaers e.g অ+া (f), ি+ ী (d) , ু + ূ (s), ৃ +র্ (a), +ে ৈ(c), ও + ৗ (x), ক+খ (j), গ+ঘ (o), ং + ঙ (q), চ + ছ চলুক, জ + ঝ (u), ঞ + হ(i), ট + ঠ (t), ড + ঢ (e) , ন + ণ (b), ত+থ (k), দ + ধ (l), প+ফ (r), ব + ভ (h), ম + শ (m), য + য় (w), র + ল (v), স + ষ অফ যা, ্র+্য(z), ৎ + ঃ (),৭+ ঁ (7), ্‌্‌ + । (g),
has been created whereas Roman character (g) or Bangla character && (hasanta) has been defined as the link key to create vowels except A & I and almost all conjuncts.2. A few special encoding has been done to implement the claim described in Claim 1.”

কোন যুক্তিতে বা কোন কোন প্যারামিটারের ভিত্তিতে তিনি এই বিন্যাস করেছেন তার কোন ব্যাখ্যা বা ক্লেইম নেই। যার ফলে তাঁর এই বিন্যাসের পেছনে যদি কোন “অরিজিনাল” যুক্তি বা প্যারামিটার তিনি ব্যবহার করেও থাকেন, এবং সেটা কোনভাবে জেনে গিয়ে ব্যবহার করে অন্য কেউ যদি কাছাকাছি ধরনের কোন লেআউট ডিজাইন করে, তাহলে তাঁর এই পেটেন্টের ক্লেইম ঐ যুক্তি/প্যারামিটারের ব্যবহারকে রদ করতে পারবেনা।

এমনকি তাঁর এই ক্লেইমে হসন্তের জন্য g বোতামটিকে ব্যবহারের যে ট্রিভিয়াল উল্লেখ আছে, সেটাও আলাদা কোন ক্লেইম হতে পারেনা। অর্থাৎ, আর কোন লে-আউটে হসন্তের জন্য বা দুটো অক্ষরকে যুক্ত করার জন্য g কে ব্যবহার করা যাবেনা এই দাবী তিনি করতে পারবেননা। কারণ এটা তাঁর “ইউনিক” লেআউটের একটা বর্ণনা, এটাকে আলাদা ক্লেইম হিসেবে দাবী করলে যৌক্তিকতার অভাবে এটি বাদ হয়ে যেত।

বাকী কী ম্যাপিংয়ের বেলায়ও একই কথা খাটে, যেমন, “ক+খ” এর জন্য আর কোন লে-আউটে (j) ব্যবহার করা যাবেনা, এরকম কোন ক্লেইম এই পেটেন্টে নেই; কারণ পরিস্কার, এ ধরনের ক্লেইমের কোন ভিত্তি নেই। আপনি একটা গাড়ী ডিজাইন করে এর জানালায় “কটকটে টিয়া” রং লাগালেন, তারপর সেটার ক্লেইম গাড়ীর পেটেন্ট ডকুমেন্টে ঢুকিয়ে দিলেন, তখন কি হবে? যাস্ট ঐ ক্লেইমটি অপসারিত হবে।

বরং বিজয়ের পেটেন্টের ক্লেইমে “ইউনিক” লে-আউট শব্দটির ব্যবহার একে খুব দূর্বল একটা ক্লেইমে পরিণত করেছে। তাঁর ডকুমেন্টের দ্বিতীয় ক্লেইমটি প্রায় মূল্যহীন, “স্পেশাল কোডিং” এত বেশী সারফেস লেভেলের ক্লেইম যে এটা কোন কিছুকেই কাভার করেনা।

ফেল্পসের ডকুমেন্টের ক্লেইমের তুলনায় তাঁরটির ক্লেইম যে অনেক অনেক দূর্বল সেটা আমরা দেখলাম। এখন, এত শক্ত কারণসমৃদ্ধ লেআউটের বেলায়ও বর্ণের সারি ওপর-নীচ করে যদি পেটেন্টের ঝামেলা এড়ানো যায়, তখন বিজয়ের এত দূর্বল ক্লেইমের বেলায় আটটি বোতামে ব্যবধান থাকার পরও বিজয়ের “ইউনিক” লেআউট কেন দাবী করবে যে ইউনিবিজয় আমার হুবহু নকল!

একটা ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে এখানে। ফেল্পস-শোলজ কেইস থেকে মনে হতে পারে, নকল করা কি এতই সোজা! একটু উল্টে-পাল্টে দিলেই হলো! আসলে তা না। বাস্তব কথা হলো কীবোর্ড লেআউটের মতো সহজ জিনিস যেটা যে কেউ নকল করতে পারে সেটার ব্যাপারে অত শক্ত ক্লেইম করা যায়না। ফেল্পসের টেলিগ্রাফপ্রিন্টার আর শোলজের টাইপরাইটারের যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো (যেগুলোর মাধ্যমে শক্ত ক্লেইম করা যায়) ছিলো আলাদা, সেখানেও যদি শোলজ একটু উল্টেপাল্টে দেয়ার প্রয়াস নিতেন তাহলে ফেল্পস ছেড়ে কথা বলতেননা।

আসলে এত কথার দরকার নেই। কী বোর্ড লে আউট কতটা অর্থহীন পেটেন্ট তার একটা চিত্র এখানে আছে, ইয়াসুওকা’স ডায়রী নামক একটি জাপানী ভাষার ব্লগ, লেখক এনটিটি পাবলিশার্স থেকে কোয়ের্টির ইতিহাস নিয়ে একটি বই বের করে বিখ্যাত হয়েছেন, খুব ডিটেইলড বই। সেসময়ে পেটেন্ট করানো কয়েকটি লেআউটের সাদৃশ্য থেকে আসুন এটা বোঝার চেষ্টা করি।

১৮৭৩ এর নভেম্বরে ক্লাফ-ম্যাকেন্ড্রির পেটেন্ট করা লেআউট
2 3 4 5 6 7 8 9 – , _
Q W E R T U I O P Y :
┇ A S D F G H J K L M
& Z C X V B N ? ; . ‘

১৮৭৪ এর এপ্রিলে শোলজের পেটেন্ট করা লেআউট
2 3 4 5 6 7 8 9 – , _
Q W E R T Y U I O P :
┇ A S D F G H J K L M
& Z C X V B N ? ; . ‘

১৮৭৮ এর জানুয়ারীতে শোলজের আরেকটি কী-বোর্ড
2 3 4 5 6 7 8 9 –
q w e r t y u i o p
a s d f g h j k l m
z c x v b n , ; !

১৮৮২ তে যখন রেমিংটনের কর্ণধার হয়ে দাঁড়ান ওয়াইকফ, সীম্যানস আর বেনেডিক্ট, তখন শোলজের পেটেন্টের ঝামেলা এড়ানোর জন্য তারা ব্যবহার করেন নীচের লেআউট
2 3 4 5 6 7 8 9 –
q w e r t y u i o p
a s d f g h j k l ;
z x c v b n m , !

ওয়াইকফদের লেআউটে শোলজের লেআউটের সাথে পার্থক্য শুধু m x c ; এর অবস্থানে। এটার মূল কারণ লেআউট পেটেন্টের ঝামেলা এড়ানো।

ইতিহাস থেকে আশা করি বোঝা সম্ভব হবে যে কী-বোর্ডের লেআউটের পেটেন্ট কতটা দূর্বল হতে পারে। আমার ধারনা, পেটেন্টের আইনের বিষয়ে যারা জানেন, তাঁরা এ বিষয়টা আরো অনেক শক্তভাবে আদালতে তুলে ধরতে পারবেন।

২। এবার দ্বিতীয় প্রশ্ন, টেকনিকাল অরিজিনালিটি কতটুকু?

এখানে আমি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই সচলায়তনে কয়েকদিন আগে দেয়া একটি পোস্ট, যেখানে সিউল রায়হান তাঁর রোকেয়া কী-বোর্ডটির বর্ণনা দিয়েছেন। এই আলোচনায় ঐ পোস্টটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেন?

সিউল তাঁর কাজে যা করেছেন, তার একটি অংশ হলো, কী-বোর্ড ডিজাইনের জন্য স্বীকৃত যে প্যারামিটারগুলো, সেগুলো ব্যবহার করে বাংলা টাইপিংয়ের জন্য অপটিমাইজড একটি কী-বোর্ড লেআউট বের করা।

এই লেআউটে যদি সিউল তাঁর নিজের চিন্তা করা কোন প্যারামিটার ব্যবহার না করে শুধু লিটারেচারে বিদ্যমান স্ট্যান্ডার্ড প্যারামিটার ব্যবহার করেন, তাহলে সেই লেআউট পেটেন্ট করা যাবেনা, কারণ টেকনিকাল অরিজিনালিটি নেই। এখন মজার ব্যাপার হলো, সিউল একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন ওখানে, যেটা হলো, স্ট্যান্ডার্ড প্যারামিটার ব্যবহার করে যে লেআউটটি বাংলার বেলায় পাওয়া যায় সেটি বিজয়ের লেআউটের সাথে ভীষন সাদৃশ্যপূর্ণ।

বিজয়ের ব্যাপারে তাঁর এই আপাতঃ প্রশংসাটি বিজয়ের পেটেন্টের শক্তিকে আরো নাজুক করে ফেলছে। যেমন এখন যদি সিউল নিজের হিসেব করে প্রাপ্ত সেই “বিজয়ের লেআউটের সাথে ভীষন সাদৃশ্যপূর্ণ” লেআউটটি তাঁর সফটে ব্যবহার করেন এবং তাতে যদি মোস্তফা জব্বার অভিযোগ করেন, তখন কিন্তু সিউলের প্রমাণ করার সুযোগ থাকে যে তিনি ডেভেলপমেন্টের সময় বিজয় সফটওয়ারটির দিকে তাকিয়েও দেখেননি। তিনি স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর অনুসরণ করে এই লেআউটটি নির্ণয় করেছেন।

ব্যাপারটাকে আমরা যদি উল্টো করে দেখি, তাহলে বলা যায় যে বিজয়ের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ যে কোন লেআউটের বেলায়ই দাবী করা যায় যে স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর অনুসরণ করে এটি বানানো হয়েছে, মানে বিজয় নিজেও ওভাবেই নির্ণীত হয়েছে। কাজেই “নট ওনলি” চোখ টিপি ইউনিবিজয় যে সেভাবে তৈরী হয়নি আদালতে এটা দাবী করার যৌক্তিকতা জব্বার সাহেরবের জন্য থাকেনা, “বাট অলসো” চোখ টিপি আদালতই তাঁকে প্রশ্ন করতে পারে যে লিটারেচারে থাকা স্ট্যান্ডার্ড প্রসিডিওর অনুসরণ করে বানানো তাঁর এই লেআউটের অরিজিনালিটি কি?কেন এর পেটেন্টশীপকে বাতিল করা হবেনা?

৩। পেটেন্ট সাবমিশনের সময়কাল
মোস্তফা জব্বার তাঁর এই লেখাটিতে বলছেন,

উদ্ধৃতি

“২০০৪ সালের ২৯ জুলাই এই ব্যতিক্রমী প্যাটেন্টটির অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, ১৯৯২ সালে প্রথম এই প্যাটেন্টটির জন্য আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়ে প্যাটেন্ট অধিদপ্তর এই আবেদনটি গ্রহণ করেনি। এর অন্যতম কারণ ছিল, এটি সফটওয়্যার হিসেবে কিভাবে প্যাটেন্ট অনুমোদন পাবে সেটি তখন নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। এমনকি এই প্যাটেন্টটি পরীক্ষা করার মতো জ্ঞানী কোন কর্মকর্তাও তখন ছিল না।
কিন্তু ২০০৪ সালের আবেদনটি বিবেচনা করা হয়। সুদীর্ঘ সময় পরে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গত ১০ মে ২০০৭ তারিখে এই প্যাটেন্টটির গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী গেজেট প্রকাশের ১২০ দিনের মধ্যে এর ব্যাপারে কোন আপত্তি না ওঠায় এর প্রত্যয়ণপত্র প্রদান করা হয়। আপাতদৃষ্টে এটি একটি সাধারণ ও নিয়মিত ঘটনা মনে হলেও বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য এটি একটি গুরুত্ব্বপূর্ণ ঘটনা।”

বাংলাদেশের পেটেন্ট অধিদপ্তরের “পরীক্ষা করার মতো জ্ঞানী কোন কর্মকর্তা” থাকুন বা না থাকুন, তাঁর লেআউটের পেটেন্টটির আইনের চোখে সাবমিশন হয়েছে ২০০৪ সালের জুলাইয়ের শেষে। এর আগ পর্যন্ত তাঁর বিজয় সফটওয়ার কপিরাইটকৃত ছিলো, লেআউটের পেটেন্ট ছিলোনা।

এদিকে মেহদী বলছেন যে ২০০৩ সালেই তাঁরা ইউনিবিজয় তৈরী করেছেন। তাহলে পেটেন্ট বিষয়ক আইন অনুযায়ী জব্বার সাহেব কোনভাবেই ইউনিবিজয়ের তৈরীতে বাঁধা দিতে পারেননা। সত্যি বলতে, ইউনিবিজয় আর বিজয় যদি অবিকল হতো, তখন বরং অভ্র কর্তৃপক্ষের এই আইনগত অধিকার চলে আসতো যে আমাদের প্রোডাক্টেরও লেআউট যেটি, সেটি শুধু উনি পেটেন্ট করছেন কেন?

এখানে সময়কালের ব্যাপারে মোস্তফা জব্বার দাবী করতে পারেন যে ১৯৮৭ সাল থেকে তাঁর কপিরাইট ছিলো। তবে কপিরাইটের দাবী দিয়ে তিনি অভ্র টিমকে একটা মামুলি লে আউট ব্যবহারে বাঁধা দিতে পারেননা। তিনি নিজেও অবশ্য সেটা স্বীকার করেছেন, এবং আমার ধারনা অভ্র টিমের ২০০৩ সালে পাঠানো প্রস্তাবের পর তিনি ভয় পান যে তাঁর একচেটিয়া বাজার নষ্ট হতে পারে, যেজন্য ১৯৯২ তে রিজেক্টেড হওয়া পেটেন্টের ব্যাপারটি নিয়ে আবারও তিনি ব্যস্ত হয়ে ওঠেন, এবং ২০০৪ এ সেটা জমা দেন। কপিরাইট বিষয়ে তিনিই বলছেন,

উদ্ধৃতি

“আমাদের সাধারণ ধারণা যে, কপিরাইটই হলো সফটওয়্যারেরও প্রধান মেধাস্বত্ত্ব সুরক্ষা। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কপিরাইট সফটওয়্যারের কপি বিতরণ করা বন্ধ করে। কিন্তু সফটওয়্যারের সঙ্গে যে নির্মাণ কৌশল ও কর্মপ্রক্রিয়া জড়িত সেটি কপিরাইটে রক্ষা করা হয়না।”

ঠিক বলেছেন তিনি। কপিরাইট তাঁর পণ্যটির নকল বিক্রী বন্ধ করতে পারবে, যেটাকে আসলে “পাইরেসী” বলা হয়। অর্থাৎ, অন্য কেউ যদি অবিকল বিজয়ের মতো সফট/হার্ড বানায় এবং বিজয় নামে বিক্রী করে, তখন কপিরাইট আইন তাঁকে বাঁচাবে।

৪।টাইমিংয়ের ব্যাপারে আরেকটা প্রশ্ন

২০ বছর ধরে একটা প্রডাক্টের কপিরাইট ধরে রেখে, সেটার বাজারজাত করে, লোকজনকে সেটাতে অভ্যস্ত করে অতঃপর যখন দেখা গেলো যে সেরকম প্রোডাক্ট বানানোর মতো আরো অনেক টেকনিকাল হ্যান্ড দেশে আছে, তখন সেটার পেটেন্টশীপ আবেদন করা — এটা বাংলাদেশের আইনে যৌক্তিক কিনা সেটাও খতিয়ে দেখার দরকার আছে।

কারণ এটি বিজয় বা এর কাছাকাছি লেআউট ব্যবহারে অভ্যস্ত কাস্টমারদেরকে বিজয় কিনতে বাধ্য করার মতো একটি অপরাধ।

৫।রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ইস্যু

সফটওয়ারের পেটেন্টশীপের কাভারেজ এরিয়া কতটুকু হবে এই নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। এজন্য এখনও আমরা যখন একটা সফট লেভেলের পেটেন্ট সাবমিট করি, সাথে এটির ইমপ্লিমেন্ট করা একটি হার্ডের বা যন্ত্রেরও পেটেন্ট করে রাখি — কারণ তা নাহলে আসলে কিছুই প্রোটেক্ট করা হয়না। যেমন চিন্তা করুন, এম এস ওয়ার্ডে বোল্ডের মতো আরেকটা অপশন রাখা হলো, যাতে একটা লেটারকে ডাবল লেয়ারড দেখাবে। এখন একই অপশন যদি অন্য কেউ তার এডিটরে যোগ করে, মাইক্রোসফট বাঁধা দিতে পারবেনা। যদি মাইক্রোসফট দেখাতে পারে যে তাদের কোড চুরি করে ওটা করা হয়েছে, তখনই কেবল ওটাকে থামানো সম্ভব। এজন্যই আমরা সব ধরনের সফটওয়ার এ্যাপ্লিকেশনের ফ্রিওয়ার ভার্সন আজকাল দেখতে পাই। যেজন্য সফটওয়ার ভেন্ডরদের দিনরাত নতুন নতুন ফিচার যোগ করে ফ্রিওয়ারওয়ালাদের চেয়ে দৌড়ে এগিয়ে থাকতে হয়। মাইক্রোসফট, এডোবি, ম্যাটল্যাব — কারো ছাড়ান নাই।

এখন মোস্তফা জব্বার আপনিই বলুন, একটা টাইপরাইটার সফটওয়ারের রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বেলায় একই রকম লেআউট ছাড়া আর কি নিয়ে কি করা যাবে?
মনে রাখবেন, কী-বোর্ড লেআউটের পেটেন্ট এতটাই দূর্বল।

৬।স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন এবং শেষকথা

জনাব মোস্তফা জব্বারের প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিজয়ের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। এমন একটি পণ্যের তৈরীর উদ্যোগ ও বাজারজাতকরণের দক্ষতার কারণে এ ব্যাপারে তাঁর অবদানও অনস্বীকার্য। নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষায় কম্পিউটিংয়ে তাঁর এই অবদান অনেক বড় একটা জায়গা দখল করে থাকবে।

তবে কেন তাঁর বিরুদ্ধে এট জনরোষ? কারণটা সবাই জানি, তাঁর সবকিছু কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা, এবং সেই প্রবণতাজনিত মিথ্যাচার (অভ্রবিষয়ে, আবারও বলছি ইউনিবিজয় “অবিকল” বিজয় না)।

কিন্তু এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে লেআউট-বেইসড কম্পিউটার টাইপরাইটিংয়ে বিজয়ের লেআউটটিতেই মনে হয় ৯০ ভাগ বা তারও বেশী ব্যবহারকারী অভ্যস্ত। আবার সোনায় সোহাগার মতো বাংলাদেশের আইটি বিষয়ক নানান কমিটির নানান বড় পদেও তিনি আসীন।

এজন্যই মোস্তফা জব্বার যা করতে পারেন, তা হলো তাঁর এই বিজয় লেআউটটিকে পেটেন্টমুক্ত করে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারেন। যেহেতু এত লোক এতে অভ্যস্ত, তাই এটিই হতে পারে লেআউট-বেইসড বাংলা কীবোর্ডের স্ট্যান্ডার্ড। খানিকটা আর্থিক ত্যাগ স্বীকারই তাঁর “বিজয়”কে বাংলা কম্পিউটিংয়ের জগতে চিরস্থায়ী করে ফেলতে পারে।
তিনি অভ্র টিমকে এই অনুরোধও করতে পারেন যে ইউনিবিজয় যেহেতু বিজয়ের খুব কাছাকাছি, কাজেই এটিকে একটু বদলে বা এর পাশাপাশি পুরোপুরি অবিকল বিজয়ের লেআউট একটা করে ফেলা হোক, যাতে বিনামূল্যে যারা “অবিকল” বিজয় লেআউটে লিখতে চায়, তারা সেই সুবিধাটুকু পায়।

এমনকি আর্থিক ত্যাগ স্বীকার না করেও তিনি এভাবে বিজয়কে মুক্ত ও চিরস্থায়ী করে ফেলতে পারেন। তবে সেটা কিভাবে হতে পারে সেই মডেলের কথা বিনামূল্যে বিতরনের ইচ্ছে আপাততঃ আমার নেই। চোখ টিপি

(পোস্টটিতে বানান, ব্যকরণ, বাংলিশজনিত অনেক সমস্যা আছে, আগেই সার্বিক দুঃখ প্রকাশ করে রাখছি।)

Advertisements
%d bloggers like this: