গুটেনবার্গ থেকে শাইলক – ইশতিয়াক রউফ

2010/05/01 at 11:05 অপরাহ্ন (প্রতিক্রিয়া, যুক্তিপ্রমাণ)

শিরোনামঃ গুটেনবার্গ থেকে শাইলক

লেখকঃ ইশতিয়াক রউফ

সাইটের প্রকৃতিঃ সচলায়তন কমিউনিটি

সময়ঃ(তারিখ: শুক্র, ২০১০-০৪-৩০ ২২:৩৩)

লিংকঃ http://www.sachalayatan.com/ishtiaqrouf/31861

লেখাঃ

প্রকাশনাশিল্পের জনক হিসেবে সুবিদিত ইয়োহানেস গুটেনবার্গের নাম সবাই জানেন। তাঁর কল্যাণে পঞ্চবিংশ শতাব্দিতে মুদ্রণশিল্পে বৈপ্লবিক উন্নতি আসে, শুরু হয় ছাপাখানার যাত্রা। গুটেনবার্গ অগ্রপথিক ছিলেন, পরহিতৈষী নয়। তাঁর কাছ থেকে এমনতর প্রত্যাশাও ছিলো না কারও। ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি নিজের উদ্ভাবনকে ব্যবসায়িক ভাবে প্রয়োগের প্রয়াস পেয়েছেন, এবং সে-কারণে তাঁকে কেউ কটাক্ষ করে না। তাঁর ব্যবসার জন্য যা মঙ্গল, সর্বসাধারণের জন্যও তা মঙ্গল ছিলো। বাংলা প্রকাশনাজগতে মোস্তফা জব্বার ও বিজয় নিয়েও একই কথা বলা যায়।

কম্পিউটারে বাংলা লেখার সফটওয়্যার প্রণয়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর আগে-পরে অনেকেই বাংলা কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু তাঁর মাপের সাফল্য তেমন কেউ অর্জন করতে পারেননি। তিনি মুদ্রণ জগতে বাংলার প্রচলনে ভূমিকা রেখেছেন, বাংলা লে-আউট প্রণয়ন করেছেন, বিভিন্ন গ্রাফিক্স সফটওয়্যারে বাংলা ব্যবহার সহজ করেছেন, কম্পিউটার আমদানিকে শুল্কমুক্ত করতে দেন-দরবার করেছেন। ছিদ্রান্বেষণ করতে চাইলে অনেক কিছু বলা যায়, কিন্তু তাঁর এই অবদানগুলোর আলোকে তাঁকে কেউ বাংলাদেশের গুটেনবার্গ ডেকে থাকলে তা খুব অন্যায্য আচরণ হবে না। তিনি কত লাইন কোড লিখেছেন কিংবা কোন বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন, তা অবান্তর। তিনি দীর্ঘকাল ধরে বাংলা কম্পিউটিং-এর অন্যতম পুরোধা ব্যাক্তিত্ব ছিলেন, এটাই বিবেচ্য।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এই উচ্চাসন থেকে মোস্তফা জব্বারের পতন হয়েছে। ‘অভ্র বনাম বিজয়’ বিতর্ক অনেক দূর এগিয়েছে এই ক’দিনে। চোখ-কান খোলা আছে, এমন সবাই জানেন এ-কথা। শুরুটা বেশ স্পষ্ট – দৈনিক জনকণ্ঠে মোস্তফা জব্বারের একটি লেখা। তবে ঘটনাপ্রবাহে আজকে দ্বন্দ্বের মূল জায়গাটি অস্পষ্ট হয়ে গেছে কিছুটা, কারণ এই বিতর্কের স্ফুলিঙ্গ আগুন ধরিয়েছে ছড়িয়ে থাকা অনেক রকম বারুদে। মুদ্রণ জগত বনাম আন্তর্জাল, প্রবীন বনাম নবীন, ব্যবসায়িক বনাম অলাভজনক উদ্যোগ, ফিক্সড বনাম ফোনেটিক, ইত্যাদি অনেক দ্বন্দ্বের মাঝে মূল বিষয়টি হারিয়ে গেছে। ভিন্ন মত বা পথের সন্ধান দিলেই বার্ধক্যের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় প্রচলিত প্রতিষ্ঠানাদি তথা হাইকোর্ট দেখানো। প্রবীন প্রজন্মের সদস্যরা সেই পথে হাঁটছেন, পত্রিকার পাতায় অভ্র টিমের প্রতীক মেহদী হাসান খান পাচ্ছেন “চোর”, “দস্যু” ও “ডাকাত”-এর অভিধা। পক্ষান্তরে, তারুণ্যের সব অনুভূতিই নিরেট, নিখাদ, সমস্বত্ত্ব। কিছু ক্ষেত্রে এই সমস্বত্ত্বতা যুক্তি ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে আবেগের দেবতার কাছে সমর্পণ করে। এরই ফলশ্রুতিতে আন্তর্জালের প্রতিবাদগুলো এক পর্যায়ে উদ্ভাবনী না হয়ে অমার্জিত হচ্ছে বেশি। ফেসবুক কিংবা পত্রিকার ওয়েব পাতায় কেউ তাঁর সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চাচ্ছেন, কেউ তাঁকে বিবিধ প্রাণীর খাবার হিসেবে পরিবেশন করছেন, ইত্যাদি। কিছু ছাগসমাজের-অর্জুন এই সুযোগে নিজেদের বিলুপ্ত সফটওয়্যারকে প্রচলিত করার বাসনায় রটাচ্ছেন যে অভ্র নিকট ভবিষ্যতে আর বিনামূল্য থাকছে না, ইত্যাদি।

এই ডামাডোলে দু’টি পক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে যারা পরষ্পরের কোনো অবদানই স্বীকার করে না। সে-কারণেই আবারও স্পষ্ট করে দেওয়া প্রয়োজন, বিজয় কিংবা লে-আউট নিয়ে নয়, ক্ষোভের কারণ অভ্র ও মেহদীর বিরুদ্ধে একের পর এক পত্রিকায় মোস্তফা জব্বারের আক্রমণাত্মক প্রচারণা।

আক্রমণের ধারা থেকে ধারণা করা যায়, ‘বিজয়’ ব্যবসায়িক ভাবে বিপণ্ন বোধ করছে প্রতিযোগী একটি লে-আউটের কারণে। মোস্তফা জব্বার কারণ দেখাচ্ছেন, অভ্রের কারণে তাঁর ৫ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে, জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থান ইউএনডিপি এর সাথে জড়িত, অভ্র ব্যবহার করার কারণে জেলায় জেলায় কম্পিউটার হ্যাকিং হচ্ছে, ইত্যাদি। শেষ অভিযোগটি মূর্খতার নামান্তর, তাই সে-প্রসঙ্গ থেকে বিরত থাকছি। মূল প্রশ্ন হলো, এত বছর পর আজ কেন মোস্তফা জব্বার এতটা আতংকিত? এর পেছনে মেধাস্বত্ব নয়, আছে ব্যবসায়িক অভিলাষ। কারিগরী কচকচি নয়, এই দিকটি স্পষ্ট করে দেওয়াই এই লেখার প্রতিপাদ্য।

মোস্তফা জব্বার আগ বাড়িয়ে কিছু অভিযোগ এনেছেন অভ্রের নামে। সেখানেই নেটিজেনদের আপত্তি শুরু। অভ্র একটি বিনামূল্য সফটওয়্যার হওয়ায় এর প্রচার অনেক, ব্যবহারবান্ধব হওয়ায় এর অনুরাগী প্রচুর, এবং অভ্রের ডেভেলপাররা অনুকরণীয় মাত্রায় নির্বিরোধ হওয়ায় তাঁদের হয়ে অনেকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রতিবাদী হয়েছেন। প্রতিবাদ বাড়তে থাকলে মোস্তফা জব্বার ক্রমে আবেগী কথাবার্তায় সরে আসেন, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য বিষয় তুলে আনেন, ৫ কোটি টাকার কথা বেমালুম চেপে গিয়ে একে “কিছু টাকা” লেখেন। সবশেষে তিনি আসেন আইনি লড়াইয়ের প্রসঙ্গে। এই লড়াইয়ে আইন সম্পূর্ণ তাঁর পক্ষে নয় বলেই তিনি গণমাধ্যমকে ব্যবহার করেন নাম ধরে মেহদী হাসান খানকে দস্যুবৃত্তির দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।

যুক্তি, নীতিমালা, ও আইনের বিচারের জন্য পৃথক পৃথক গোষ্ঠী আছেন। অনলাইনে ছড়িয়ে যাওয়া প্রতি-বিজয় দাবানল নেভানোর উপায় একটাই – গণমাধ্যমে মোস্তফা জব্বার তাঁর ভুল স্বীকার করে নেওয়া, বিনা উষ্কানিতে পুত্রতুল্য বয়সী একটি ছেলে সম্পর্কে আপত্তিকর কথা বলার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। সাময়িক ভাবে চাপা থাকলেও তাঁর বিরুদ্ধে সঞ্চিত ক্ষোভ চলে যাওয়ার নয়। তিনি যেকোন আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিতে গেলেই এই ক্ষোভ আবার সম্মুখসারিতে চলে আসবে।

পানি যতদূর গড়িয়েছে, তাতে উল্লেখিত পথে কোনো সমাধান আশা করা একটু বেশিই উচ্চাকাঙ্খা হয়ে যায়। সে-কারণেই যৌক্তিক ও আইনি কাঠামোতে অভিযোগগুলোর বিবেচনা প্রাসঙ্গিক।

কপিরাইট-সংরক্ষিত ও প্যাটেন্টকৃত হওয়ায় মোস্তফা জব্বার অভিযোগ করছেন যে তাঁর সফটওয়্যারের “আংশিক বা পূর্ণ” অনুকরণ আইনত নিষিদ্ধ। তিনি আরও দাবি করছেন যে অভ্রে ব্যবহৃত ইউনিবিজয় লে-আউটের সাথে বিজয় লে-আউটের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য না থাকায় তা কপিরাইটের লঙ্ঘন। ইউনিবিজয় তৈরির প্রক্রিয়াকে তিনি “চোখে ধুলো দেওয়া” বলেছেন, অভ্রের সাথে এর বাজারজাতকরণকে বলেছেন “পাইরেসি” বা দস্যুতা। অভিযোগনামায় কিছু শব্দ ভুল ভাবে প্রযুক্ত হয়েছে। অভিযোগ ও প্রতিবাদের নির্যাসে যাওয়ার পূর্বে এই ভুলগুলো নিয়ে আলোকপাত প্রয়োজন।

উদাহরণ হিসেবে প্রখ্যাত ফুটবলার ডেভিড বেকহাম এবং তাঁর বাঁকানো ফ্রি-কিক ও ক্রসগুলোর কথা ধরা যাক। বাঁকানো ক্রস একটি ধারণা, যা বাস্তবায়নের জন্য নানান রকম প্রক্রিয়া আছে। অন্যান্য খেলোয়াড়দের তুলনায় বেকহামের প্রক্রিয়াটি উন্নত। তিনি বাজারজাতকরণের সুবিধার্থে একে “বেন্ড ইট লাইক বেকহাম” নাম দিতে পারেন। এটি তাঁর কপিরাইট, কেউ এই নামটি ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করতে পারবে না। আইনের বইগুলো অনেক বিস্তারিত ও বিরক্তিকর হওয়ার একটি মূল কারণ হলো, আইনের ভাষা খুব সংকীর্ণ। এতে কোনো ধরনের অনুভবগ্রাহ্যতা নেই, আছে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কিছু সংকীর্ণ সংজ্ঞা। ফলস্বরূপ, অন্য কেউ “বেন্ড ইট লাইক বেকহাম” নামটি ব্যবহার করতে না পারলেও এরূপ নামকরণের ধারণাটি কাজে লাগাতে পারেন নির্বিঘ্নে। এ-কারণেই “স্বামী কেন আসামী”র অনুকরণে “বাবা কেন চাকর” নামকরণ করলে তা কপিরাইট লঙ্ঘন হয় না। একই ভাবে “বেন্ড ইট লাইক বেকহাম”-এর অনুকরণে “টুইস্ট ইট লাইক আলফাজ”, “ডক্টর পেপার”-এর অনুকরণে “মিস্টার পিব”, কিংবা “বিজয়”-এর অনুকরণে “ইউনিবিজয়” লিখলে তাতে কপিরাইট লঙ্ঘন হয় না। সমার্থক ও সমোচ্চারিত হাজারো নাম কপিরাইট-সংরক্ষিত করা হলেও লখিন্দরের বাসরের মতো কোনো না কোনো ফাঁক গলে প্রতিযোগী একটি নাম এসে পড়ে। সে-সময় অনুযোগ না করে প্রতিযোগিতায় মনোনিবেশই বুদ্ধিমানের কাজ।

এবার আসা যাক প্যাটেন্ট প্রসঙ্গে। ধরা যাক বেকহাম তাঁর বাঁকানো ফ্রি-কিক নেওয়ার প্রক্রিয়াটি বাজারজাত করতে চাইছেন। বাজার মানেই হাজারও ঠগের আস্তানা। নিজের উদ্ভাবনকে বাজারে নিয়ে গেলে তাই চুরির ভয় আছে। এ অবস্থায় উদ্যোক্তার কিছু নিরাপত্তা প্রয়োজন, ঠগদের দূরে রাখার মতো একটি ‘বড় ভাই’ প্রয়োজন। বৃহত্তর স্বার্থে রাষ্ট্র এই সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। উদ্ভাবক তাঁর সৃষ্টির পেছনের রহস্য রাষ্ট্রের কাছে উন্মুক্ত করে দেন, বিনিময়ে রাষ্ট্র ঐ উদ্যোক্তাকে প্যাটেন্টকৃত পণ্য বাজারজাতকরণের পূর্ণ অধিকার দেয়। অতএব, বাঁকানো ফ্রি-কিকের বিপণন করতে হলে রাষ্ট্রের কাছে বেকহাম প্রকাশ করতে বাধ্য যে খেলার আগে দু’খানা ডিম না খেলে তাঁর ফ্রি-কিকগুলো ঠিকঠাক বাঁক নেয় না।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্র এখানে শুধুই অনুমতি দেয় না, নিরপেক্ষ তুলনাও করে থাকে। ধরা যাক শেখ মোহাম্মদ আসলাম হুবহু একই রকম বাঁকানো ফ্রি-কিক নিতে পারেন, এবং তিনিও তাঁর এই প্রক্রিয়াকে বাজারজাত করতে চান “আসলামপুর” নামে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র খতিয়ে দেখবে আসলামও দু’খানা ডিম খেয়ে এই ফ্রি-কিক নিয়ে থাকেন কিনা। যদি তাই হয়ে থাকে, তবে সম্পূর্ণ নিজস্ব ভাবে উদ্ভাবিত হওয়ার পরও আসলাম তাঁর ফ্রি-কিকের স্বত্ব পাবেন না। বাজারজাতকরণের জন্য তাঁকে অন্য কোনো কিছু তৈরি করতে হবে। পক্ষান্তরে, যদি রাষ্ট্র খতিয়ে দেখে যে আসলামের এই বাঁকানো ফ্রি-কিকের মূলে আছে লাইফবয় সাবান, তাহলে আসলাম তাঁর পণ্য বাজারজাত করতে পারেন। বাহ্যত দেখতে অভিন্ন হলেও তাঁর অন্তর্নিহিত প্রক্রিয়া ভিন্ন। যদিওবা বাঁকানো ফ্রি-কিকের ধারণা তিনি বেকহামকে দেখে পেয়ে থাকেন, তবুও তাঁর নিজস্ব প্রক্রিয়া স্বীকৃতি পাবে প্যাটেন্ট করবার সময়। অতএব, অভ্রকে বিজয় বা এর কোনো অংশের অনুকরণ বলে দাবি করলে রাষ্ট্র খুব সহজেই দুইয়ের সোর্স কোড ঘেঁটে মিলের পরিমাণ অনুসন্ধান করতে পারে।

এই তুচ্ছ উদাহরণের উদ্দেশ্য ছিলো অভ্রের বিরুদ্ধে একটি মুখ্য অভিযোগ সম্পর্কে আলোকপাতের পটভূমি তৈরি করা। অভিযোগটি হলো, বিজয়ের তুলনায় অভ্রে যথেষ্ট পরিমাণ পার্থক্য নেই। মেহদী হাসান খান জানিয়েছেন যে বিজয়ের তুলনায় অভ্রের ইউনিবিজয়ে ৮টি পার্থক্য আছে। মোস্তফা জব্বার দাবি করছেন যে এই পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। এ অবস্থায় প্রশ্ন হলো, আইনের চোখে পার্থক্য কিংবা পরিবর্তনের সংজ্ঞা কী?

যেকোন প্রযুক্তি বা প্রক্রিয়া প্যাটেন্ট করতে গেলে তা খুব সংকীর্ণ ও বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করতে হয়। প্যাটেন্ট যেমন এক উদ্ভাবকের সৃষ্টিকে নিরাপত্তা দেয়, তেমনি অন্য উদ্ভাবকের পথ বন্ধ করে দেওয়াও রোধ করে। সে-কারণেই কেউ চাইলেই বাংলা ভাষার সকল শব্দ নিজের নামে কপিরাইট করতে পারেন না, কিংবা বাংলা বর্ণমালার সকল রকম সম্ভাব্য বিন্যাসকে কুক্ষীগত করতে পারেন না। বিজয়ের সাথে বাহ্য সাদৃশ্য থাকলেই তাই অন্য কোনো লে-আউট চুরির মাল হয়ে যায় না। খুব নির্দিষ্ট একটি লে-আউট ‘বিজয়’ নামে প্যাটেন্টকৃত। এর তুলনায় চুল পরিমাণ ভিন্নতা থাকলেও তা নতুন, যদি না নির্দিষ্ট ঐ লে-আউটটিও মোস্তফা জব্বারের প্যাটেন্ট করা থেকে থাকে। স্রেফ আপাত-সাদৃশ্যের দোহাই দিয়ে বর্ণমালার সকল সম্ভাব্য বিন্যাসকে রুদ্ধ করে রাখা সম্ভব নয়।

বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গে উন্নতি একটি ক্রমযোজিত ধারণা। অতএব, “সম্পূর্ণ বা আংশিক” অনুকরণের নামে পূর্বের কাজকে বাতিল করা যায় না, বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথে দেওয়াল তুলে দেওয়া যায় না। এ-কারণেই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হয়, উদ্ভাবনকে গতিশীল রাখতে হয়, পরিবর্তনকে শতাংশ দিয়ে বিচার করে ভবিষ্যতের দ্বার রুদ্ধ করে রাখা যায় না। শতাংশের বিচারে পরিবর্তন কতটা অচল ধারণা, তা বোঝাতে দু’টি ছোট উদাহরণ দেওয়া যায়। অধমের ধর্মপত্নী বানরের এইডস নিয়ে কাজ করে। কাঠখোট্টা ভাষায় বললে সিমিয়ান ইমিউনো ভাইরাস। অধমকে লেখা একটি এক-লাইনের চিঠিতে বৌ লিখেছিলো – “বানর আর মানুষের ডিএনএ-তে ৯৫% মিল আছে, তবে আমি তবুও ভালোবাসি তোমাকে”। হায়, আস্ত ৫ শতাংশ ভিন্নতা সত্বেও মাফ পেলাম না।

অন্য উদাহরণটি পত্রিকায় পাতায় পেশকৃত একটি অভিযোগের আলোকে দিচ্ছি। প্রশ্ন করা হয়েছে, নজরুলে কবিতায় একটা লাইন নিজে থেকে জুড়ে দিলেই কি তা নিজের হয়ে যাবে? এ-প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় রিটন ভাইয়ের লেখা “আলো আমার আলো” কবিতাটি স্মরণ করা যায়। রবি ঠাকুরের লেখা লাইনগুলোর সাথে নিজের লাইন জুড়ে তিনি বুনেছিলেন তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

“আলো, আমার আলো, ওগো আলো ভুবন ভরা
সেই আলোতে গান কবিতা গল্প ছবি ছড়া।

আলো নয়ন-ধোওয়া আমার আলো হৃদয়হরা
রবির আলোয় উদ্ভাসিত প্রিয় বসুন্ধরা

নাচে আলো নাচে–ওভাই আমার প্রাণের কাছে,
নিঃশ্বাসে বিশ্বাসে আমার রবীন্দ্রনাথ আছে।”

এই কবিতার স্বত্ব লুৎফর রহমান রিটনের এবং এতে তিনি রবি ঠাকুরকে স্বীকৃতি দিয়েছেন কবিতাটির ধারণার জন্য। অভ্রও কি বিজয়কে অনুরূপ স্বীকৃতি দেয়নি ইউনিবিজয় প্রবর্তনের ক্ষেত্রে? সেখানে কি অনুরূপ ভিন্নতা নেই? যদি তা-ও যথেষ্ট না হয়, তবে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যায় প্যাটেন্ট আইনেরই আরেকটি দিক সম্পর্কে, যা সাধারণ জ্ঞানলব্ধ কোনো কিছুকে কুক্ষীগত করা প্রতিহত করে। ব্যবহারের ফ্রিকোয়েন্সি বিচারে কি-বোর্ড লে-আউট প্রবর্তন একটি শতবর্ষপুরনো ধারণা, যার প্রয়োগ প্রচলিত সব কি-বোর্ডেই বিদ্যমান।

আইনের কচকচিতে যেতে চাইলে আরও একটি বিষয় তুলে আনা যায়। বিজয় লে-আউট প্রাথমিক অবস্থায় কপিরাইট-সংরক্ষিত করা হয়েছিলো “সাহিত্য” হিসেবে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, সংগীত, বা মূল্যবোধের মতো নিরাবয়ব বস্তুকে আইনের শাসনে বন্দী করা দুষ্কর। দ্বিতীয়ত, সে-সময় প্যাটেন্টকৃত হলেও তা ২০ বছর পর কার্যকর থাকতো না। আরও বলা যায়, বিসিসি কর্তৃক প্রণীত ‘জাতীয়’ লে-আউটের সাথেও কিন্তু ইউনিবিজয়ের মিল একই পরিমাণ, কারণ বিজয় ও জাতীয় লে-আউট দুটোয় স্রেফ ইংরেজি এফ এবং জে বাটনদ্বয়ের স্থানান্তর হয়েছে।

এই বিষয়গুলো মোস্তফা জব্বারেরও অজানা নয়। আইনী লড়াইয়ের পথে অনেক বাধা, তাই তিনি ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যমে কুৎসা রটনায় নেমেছেন। বিনা প্রমাণে এমনতর কটুক্তি ছড়ানো বরং আইনত দণ্ডনীয়। মূল গাত্রদাহ তাই কপিরাইটে নয়, নির্বাচন কমিশনের ৫ কোটি টাকা বাগাতে না পারা। জাতীয় পরিচয়পত্র প্রণয়নের সংবাদে তিনি ব্যবসার সুযোগ দেখেন, সামান্য লে-আউটের জন্য কম্পিউটারপ্রতি ৫০০০ টাকা হেঁকে বসেন। মুক্তবাজারের কথা এসেছে মোস্তফা জব্বারের বিভিন্ন লেখায়। পশ্চিমা যেকোন দেশে এমনটি করলে তিনি প্রাইস-গাউজিং, ম্যালপ্র্যাকটিস, কিংবা অ্যান্টিট্রাস্টের দায়ে ফেঁসে যেতেন। খোলা বাজারে আজ উইন্ডোজ-৭ কিনতে পাওয়া যায় এর চেয়ে কম দামে। পাশাপাশি তিনি হার্ডওয়্যার বিক্রি করেও অর্থ উপার্জন করতেন, করেছেন। এক কালের গুটেনবার্গ এভাবেই দশকের পর দশক ধরে অর্জিত সহানুভূতি বিকিয়ে দিয়ে শাইলক হয়ে গেছেন।

৮টি বর্ণে ভিন্নতাকে যদি মোস্তফা জব্বার “চোখে ধুলো দেওয়া” ভেবে থাকেন তবে তা-ই। তাঁর এই দাবিতে অনুযোগ করার মতো সত্য আছে, নেই অভিযোগ করার মতো আইনী জোর। তিনি শাইলকের মতো আমাদের বাংলা লেখার অধিকারের হৃদপিণ্ড থেকে “পাউন্ড অফ ফ্লেশ” চেয়েছেন, এই ৮টি বর্ণ তাঁর শাইলক-সুলভ আচরণ থেকে আমাদের রক্ষা করেছে। মাংসের তুলনায় রক্ত বড় তুচ্ছ, বর্গীয় বর্ণের তুলনায় খণ্ড-ত থেকে চন্দ্রবিন্দু পর্যন্ত বর্ণগুলোও তাই। তবু এই ক্ষুদ্র বর্ণগুলোই উপকারী গুটেনবার্গ থেকে স্বার্থান্বেষী শাইলক হয়ে যাওয়া মোস্তফা জব্বারের হাত থেকে অভ্রকে চূড়ান্ত নিরাপত্তা দিয়েছে।

বাংলা কম্পিউটিং-এর পথিকৃত হিসেবে মোস্তফা জব্বারের উপলব্ধির সময় এসেছে যে স্রেফ উচ্চমূল্যে লে-আউট বিক্রি করে তিনি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। বাংলা কম্পিউটিং-কে এখনও অনেক কিছু দেওয়ার আছে তাঁর। সেদিকেই মনোনিবেশ করা জরুরী। তাঁর ‘বিজয়’ লে-আউটে অনেকেই অভ্যস্ত। এ-যুক্তি খুবই ঠিক যে ইংরেজি হরফে বাংলা লেখা কখনও সম্মানজনক সমাধান হতে পারে না। ফোনেটিক লে-আউট অনভ্যস্ত প্রজন্মের জন্য একটি স্টপ-গ্যাপ সমাধান মাত্র। তিনি তাঁর বিজয় লে-আউটকে উন্মুক্ত করে দিতে পারেন, যাতে আগামী প্রজন্ম তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। একটি অভ্যস্ত গ্রাহকগোষ্ঠী থাকলে তাঁর ব্যবসাও উপকৃত হবে।

ইউনিকোডের যুগে আমাদের আসকি-তে আটকে না রেখে তিনি নিজেও এতে পদার্পণ করতে পারেন। অভ্র এক্ষেত্রে তাঁর পথ আগলে রাখবে না, বরং স্বাগত জানাবে। বিজয়ের আছে অগণিত দারুণ ফন্ট। বাংলা প্রকাশনা জগতকে ইউনিকোডে নিয়ে আসতে তিনি অগ্রণী হতে পারেন। বিজয়ের ফন্টগুলো ইউনিকোডে রূপান্তরিত করে (যৌক্তিক দামে) বাজারজাত করতে পারেন। বহুকাল ধরে প্রকাশনাশিল্পে ব্যবহৃত হওয়ায় বিজয়ে ব্যবহার্য বাংলা অভিধান ও স্পেলচেকার তৈরি হয়ে আছে। সেগুলো তিনি ইউনিকোডে রূপান্তরিত করে (যৌক্তিক দামে) বাজারজাত করতে পারেন। বাংলা ভাষাকে টিকে থাকতে হলে এর ব্যাকরণকেও টিকে থাকতে হবে। ফোনেটিক কি-বোর্ড ব্যবহার করলে ব্যাকরণ না জেনেও “শুদ্ধ” বাংলা লেখা যায়। ব্যাকরণ জেনে শুদ্ধ বাংলা লেখা প্রচলিত করতে একটি নিজস্ব কি-বোর্ড প্রয়োজন। বিজয় এক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী স্থান গড়ে নিতে পারে।

যে-শক্তি তিনি অহেতুক অপচয় করছেন অভ্রকে গালমন্দ করে, তা গঠনমূলক কোনো কাজে ব্যবহার করলে এখনও সুযোগ আছে স্বীয় সম্মান ধরে রাখার। নয়তো উঠতি প্রজন্ম হেলাভরে “খুদাপেজ” দিয়ে দেবে দ্বিতীয় চিন্তা না করেই।

ভাষা উন্মুক্ত হবেই।

Advertisements
%d bloggers like this: