অভ্র-বিজয় বিতর্ক : ব্যবসা নাকি সেবা? – আনিস রায়হান

2010/05/24 at 12:02 পুর্বাহ্ন (বিবিধ)

কম্পিউটারে বাংলা ব্যবহার করেন মোট ব্যবহারকারীর ৫০-৬০ শতাংশ । যারা প্রায় সবাই ব্যবহার করেন বিজয়। এর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। আবার এই ১৫ শতাংশের মাত্র ২০ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেটে বাংলা ব্যবহার করে। কম্পিউটারে বাংলা লেখায় বিজয় মাইলফলক হয়ে এসেছিল। বিজয়ের অবদানকে অস্বীকার করার কিছু নেই। এটি বিক্রয়যোগ্য একটি ব্যবসা পণ্য। সময়ের দাবিতেই ইন্টারনেটের এই প্রসারের যুগে বিজয়ের জায়গায় এসেছে ‘অভ্র’। মেহেদী হাসান খান এবং তার সহকর্মীদের উদ্যোগে তৈরি হলো অভ্র নামক এই সফটওয়্যারটি। যা তারা বিনামূল্যে ছড়িয়ে দিলেন সমস্ত বিশ্বে। ইন্টারনেটে বাংলায় লেখালেখির জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। যে কেউ চাইলেই এই সফটওয়্যার ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারেন। তাই অভ্র’র জনপ্রিয়তাও আকাশচুম্বী।

কিন্তু কিছুদিন ধরে যা চলছে তাতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা ব্লগে ঢুকে যে কারো মনে হতে পারে বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা এখন বিজয়-অভ্র! এই নিয়ে ইন্টারনেটে বাংলা সাইটগুলোতে চলছে তুমুল বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা। বিজয়ের মালিক মোস্তফা জব্বারের দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত একটি লেখার রেশ ধরে এই আলোচনার সূত্রপাত। ঐ লেখায় তিনি দাবি করেছেন অভ্র পাইরেটেড। বিজয়ের লেআউট ব্যবহার করে অভ্র তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। অভ্র বিষয়ে জনাব মোস্তফা জব্বার তার অভিযোগটা সরাসরি প্রকাশ করে বোঝাতে চাইছেন যে, এতে তার ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটাকে তিনি বলছেন পেটেন্ট এবং কপিরাইটের লঙ্ঘন। কিন্তু অভ্র যেহেতু বিনামূল্যে পাওয়া যায় তাই এর একটি সেবামূলক পরিচিতি দাঁড়িয়ে গেছে। এজন্য অভ্র-বিজয় বিতর্ককে অনেকেই দেখছেন সেবা ও ব্যবসার দ্বন্দ্ব হিসেবে। এ প্রসঙ্গে অভ্র’র জনক মেহেদী হাসান খান সাপ্তাহিককে বলেন, ‘ব্যবসার অধিকার সবার আছে। যে কেউ চাইলে ব্যবসা করতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি বিনামূল্যে কাউকে কোনো সেবা দিতে চান তাহলে সেখানে কারো বাধা দেয়ার অধিকার নেই বলে আমি মনে করি। বিজয় দীর্ঘদিন ধরে বাজারে আছে পাইরেটেড অবস্থাতেই। এটার ব্যবহার এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, এর ওপর মানুষের একটা অধিকার জন্মে গেছে। আমি জনাব মোস্তফা জব্বার সাহেবকে বলব যে, আপনি আপনার সফটওয়্যার বিক্রি করেন। কিন্তু জনস্বার্থে লেআউটটি উন্মুক্ত করে দিতে পারেন। এতে সকলের উপকার হবে। বাংলা ভাষায় আপনার অবদান অনস্বীকার্য হয়ে থাকবে।’

মোস্তফা জব্বারের ব্যবসা, যশ, খ্যাতি এমনকি প্রধানমন্ত্রীর আইটি বিশেষজ্ঞ হওয়া, ডিজিটাল বাংলাদেশের কারিগর হিসেবে আলোচিত হওয়ার পেছনের একমাত্র কারণ হচ্ছে তার উদ্ভাবিত বিজয় সফটওয়্যার। তিনি শুধু এবারই নয়, এর আগেও নানাভাবে ইনিয়ে-বিনিয়ে অভ্র নিয়ে তার আপত্তি জানিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি অনেক ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের ঘটনা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সুকৌশলে তিনি এর সঙ্গে জড়িয়েছেন বিনামূল্যে বাংলা লেখার সফটওয়্যার অভ্র কীবোর্ড, জাতিসংঘের ইউএনডিপি এবং নির্বাচন কমিশনকে। তিনি তার লেখায় বলেছেন, ‘আমার বিজয় সফটওয়্যারের পাইরেটেড সংস্করণ ইন্টারনেটে প্রদান করার ক্ষেত্রে এই হ্যাকাররা চরম পারদর্শিতা প্রদর্শন করেছে। এই হ্যাকার ও পাইরেটদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে ইউএনডিপির নামও যুক্ত আছে। অভ্র নামক একটি পাইরেটেড বাংলা সফটওয়্যারকে নির্বাচন কমিশনে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে ইউএনডিপির অবদান সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন সেলের ওয়েবসাইট হ্যাক হলে তার দায় থেকেও ইউএনডিপিকে ছাড় দেয়া যায় না।’

তার এই বক্তব্যের পর পরই ইন্টারনেটে আসতে থাকে একের পর এক লেখা। আইটি বিশেষজ্ঞ, সফটওয়্যার নির্মাতা, সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী অনেকেই প্রকাশ করছেন তাদের নিজস্ব মতামত। সেগুলার জবাবও দিচ্ছেন মোস্তফা জব্বার। ইন্টারনেটে প্রকাশিত অন্যদের লেখাগুলোর জবাব দিতে গিয়ে তিনি আক্ষেপ, উত্তেজনা, স্মৃতিচারণ, হতাশা, ক্ষোভ অনেক কিছুই প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন লেখা থেকে তার কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যেতে পারে।

  • ‘আমি দেখতে পেয়েছি যে অভ্র কেবলমাত্র বিজয়-এর কপিরাইট লঙ্ঘন করেনি। এটি বিজয়-এর ট্রেডমার্ক এবং প্যাটেন্টও লঙ্ঘন করেছে। তবে এই পুরো কাজটাই করা হয়েছে বিজয়-এর কীবোর্ড লেআউট নকল করে, বিজয়-এর নামের সঙ্গে বিভ্রান্তিমূলক নাম যুক্ত করে এবং বিজয়-এর বাংলা লেখার পদ্ধতি নকল করে। তবে এরকম মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন কেবল অভ্র করেনি। লেখনী, প্রশিকা, প্রবর্তন, ফাল্গুনসহ বাংলা লেখার অনেক সফটওয়্যারই এই কাজটি করেছে।’ বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো কম্পিউটার প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে সেই প্রোগ্রামের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ পুনরায় উৎপাদন করলে বা ব্যবহার করলে সেটি কপিরাইট লঙ্ঘনকারী অনুলিপি হবে। এক্ষেত্রে অভ্র বিজয়-এর অংশবিশেষ পুনরুৎপাদন করছে এবং নির্বাচন কমিশনসহ যারা অভ্র ব্যবহার করছে তারা কপিরাইট লঙ্ঘন করছে।’
  • ‘যেসব কথা বলা হয়েছে বা হচ্ছে তার প্রায় পুরোটাই হচ্ছে আবেগতাড়িত এবং ‘চিলে কান নিয়ে গেছে’ টাইপের মন্তব্য। একদল লোক তো আমাকে রীতিমতো বাংলা ভাষার শত্রুতে পরিণত করারও চেষ্টা করেছে। অবশ্য তাদের একজন নায়কও আছে: তার নাম মেহেদি হাসান খান। এখন তিনি বাংলা ভাষার ত্রাণকর্তা। কেউ কেউ তার পক্ষে ভাষা হোক মুক্ত এমন সেøাগান দিয়ে মাঠ গরম করে ফেলার চেষ্টা করেছে। বিজয় মুর্দাবাদ এবং অভ্র জিন্দাবাদ এমন স্লোগানসম্পন্ন প্রফাইল ছবি বা মোস্তফা জব্বারের গায়ে শিশুর কাপড় দিয়ে তাতে ভাষা হোক মুক্ত সেøাগান দেয়া অথবা মোস্তফা জব্বারের ছবি দিয়ে টাকার নোট বানানো বা “আমরা করবো বিজয় একদিন” এমন কার্টুন ইন্টারনেটে অনেক দেখেছি। বাংলা ব্লগ লেখার সাইটগুলোতে মোস্তফা জব্বারকে ডিজিটাল কানমলা দিতে হবে এমন মন্তব্য তো অহরহই করা হচ্ছে।
  • ‘নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে এখন কিছু কথা বলতে পারছি। কিন্তু যখন তারা আমার মেধাস্বত্ব লঙ্ঘন শুরু করে তখন আমাকে কমিশনের সচিব হূমায়ূন কবির সাহেব তার ঘর থেকে প্রায় তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কারণ তিনি তখন ভীষণ ক্ষমতাবান লোক। সেনাবাহিনী তার পেছনে ছিল। সেই দাপটে নির্বাচন কমিশন ‘অভ্র’ নামক সফটওয়্যার দিয়ে বিজয় কীবোর্ড ব্যবহার করেছে এবং ইউএনডিপি বিজয় কীবোর্ডের হার্ডওয়্যার কিনে দিয়ে সেই পাইরেসিকে সহায়তা করেছে। কেউ কেউ মনে করেন যে, অর্থ দিয়ে বিজয় সফটওয়্যার না কিনে নির্বাচন কমিশন দেশের বিশাল অর্থ সাশ্রয় করেছেন। কিন্তু তারা কি জানেন বিজয় কিনতে তাদের কতো টাকা লাগত। অতি নগণ্য হাতে গোনা কিছু টাকা। অথচ তারাই কোটি কোটি টাকা দিয়ে আঙুলের ছাপ যাচাই করার বিদেশি সফটওয়্যার কিনেছে।’
  • ‘আমি ইন্টারনেটের ব্লগে আমাকে নিয়ে আরো অনেক আলোচনা দেখেছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়েও কথা ওঠেছে। কেউ কেউ আমাকে চোর-বাটপাড়-রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো থেকে শুরু করে যত রকমের খারাপ বাক্য তার সবই শুনিয়েছে। এমন সব ছেলেরা এমন মন্তব্য করেছে যাদের বয়স আমার ছেলের চাইতেও কম। সম্ভবত এটি আমার প্রাপ্য ছিল। তেইশ বছরের কাজ করার পুরস্কার এটি। আমি তাদের জন্য দোয়া করি। ওরা ভালো থাকুক এবং দেশকে ভালোবাসুক।’
  • ‘বাংলাদেশের মতো আর কোনো দেশে চোরের মার এত বড় গলা আমি দেখিনি। চোরের এত বেশি সমর্থকও বোধ হয় দুনিয়ার আর কোনো দেশে নেই।’
    কিন্তু এসব কথা বলে মোস্তফা জব্বার তার সপক্ষে কাউকে টানতে পারেননি। কারণ তার বক্তব্যে জনসেবার কোনো রূপ দেখা যাচ্ছে না। বরং তিনি ভিনদেশিদের মতো পুরো বাঙালি জাতিকে এক কাতারে ফেলে ভর্ৎসনা করেছেন। নিজের ব্যবসাসুলভ মনোভাবকে প্রাধান্য দিয়েছেন। শত শত মানুষ তাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার বক্তব্যের প্রতিবাদে। বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলো তাদের ব্যানার পরিবর্তন করে অভ্র’র সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। ব্লগাররা যুক্তি দিয়ে মানুষকে বোঝাতে লিখে যাচ্ছেন একের পর এক ব্লগ। ফেইসবুকে খোলা হচ্ছে নতুন নতুন গ্রুপ। বাংলা ফোরামগুলো খুলছে একের পর এক থ্রেড। এমনকি অনেকে ব্যক্তিগতভাবে মোস্তফা জব্বারকে মেইল করে তাকে নিরস্ত হওয়ার অনুরোধ করছেন বলেও জানা গেছে।
    এ প্রসঙ্গে অভ্র’র জনক মেহেদী হাসান লিখেছেন, ‘একটা বিপ্লব ঘটাতে অন্তত একজনকে নেতৃত্ব দিতে হয়। সেরকম কোনো নেতৃত্ব ছাড়া সব মানুষ কীভাবে এক হয়ে গেলেন? মোস্তফা জব্বার অভ্রকে পাইরেটেড না বলে গান শোনার সফটওয়্যার উইনএ্যাম্পকে চুরি করা সফটওয়্যার বললে কি একই প্রতিক্রিয়া হতো? “ঝামেলা অভ্রর টিম সামলাক, আমাদের কী?”Ñ এই কথাটা ভেবে সবাই কেন চুপচাপ থাকলেন না? আমি তখন ঢাকার বাইরে, সঙ্গে মোবাইলে অপেরা মিনির ভাঙাচোরা বাংলা সাপোর্ট আর একটা ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়া কিছু নেই। বসে বসে সবার লেখা পড়া আর প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা ছাড়া করার কিছু ছিল না। সে উত্তর খুঁজে পেতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায়, সবাই লড়ছেন একটা স্বপ্নের জন্য। যে স্বপ্নে নিজের ভাষায় লিখতে কারো কাছে হাত পাততে হবে না। যে স্বপ্নে বাংলায় লিখলে কেউ খড়গ হাতে তেড়ে এসে জানতে চাইবে না লেখার আগে আপনি টাকা দিয়ে লেখার অধিকার কিনেছেন কিনা। মুক্ত সফটওয়্যারের ধারণাটি নতুন না, কিন্তু বাংলা ভাষার জন্য স্বপ্নটি সবাইকে প্রথমবার দেখিয়েছিল এই অভ্র। “ভাষা হোক উন্মুক্ত” কথাটা শুধু অভ্রের স্লোগান না, এটা একটা অধিকার প্রতিষ্ঠার আশ্বাস। মোস্তফা জব্বার যখন জেনে শুনে সেই অধিকারটা কেড়ে নিতে চান, মানুষ কেন চুপ করে থাকবে? স্বাধীনতার ডাক বড় খারাপ জিনিস, দাবানলের মতো তার ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না।’

মোস্তফা জব্বারের প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিজয়ের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। এমন একটি পণ্যের তৈরির উদ্যোগ ও বাজারজাতকরণের দক্ষতার কারণে এ ব্যাপারে তাঁর অবদানও অনস্বীকার্য। নিঃসন্দেহে বাংলা ভাষায় কম্পিউটিংয়ে তাঁর এই অবদান অনেক বড় একটা জায়গা দখল করে থাকবে। তবে কেন তাঁর বিরুদ্ধে এ জনরোষ? অনেকের মতে, তাঁর সবকিছু কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা, কাবুলিওয়ালাসুলভ মনোভাব এবং সেই প্রবণতাজনিত আচরণের জন্যই এই অবস্থা। এ প্রসঙ্গে বিজয়ের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা জব্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘আমি একজন ব্যবসায়ী। সুতরাং আমি আমার ব্যবসাটাকে বড় করে দেখব, এটাই স্বাভাবিক। দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবসা করাটা আমার অধিকার। বিজয় যখনই পাইরেটেড হয়েছে তখনই আমি এর প্রতিবাদ করেছি। এটাকে উন্মুক্ত করে দিতে আমি এর পেটেন্ট ও কপিরাইট করিনি। করেছি ব্যবসার স্বার্থেই। এটাকে অনেকে খাটো করে দেখছে কিন্তু আমার মেধাস্বত্ব চুরি হচ্ছে সেটাকে কেউ খাটো করে দেখছে না।’

মোস্তফা জব্বারের অভিযোগের সত্যতাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন অনেকেই। উঠে আসছে নানা ধরনের বিরোধী বক্তব্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন খ্যাতনামা আইটি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘মোস্তফা জব্বার তার লেখাতে বলছেন, ২৯ জুলাই, ২০০৪-এ তিনি এই ব্যতিক্রমী প্যাটেন্টটির অনুমোদনের জন্য আবেদন করেন। সুতরাং লেআউটের পেটেন্টটির আইনের চোখে সাবমিশন হয়েছে ২০০৪ সালের জুলাইয়ের শেষে। এর আগ পর্যন্ত তাঁর বিজয় সফটওয়ার কপিরাইটকৃত ছিল, লেআউটের পেটেন্ট ছিল না। এদিকে মেহেদী বলছেন যে, ২০০৩ সালেই তাঁরা ইউনিবিজয় তৈরি করেছেন। তাহলে পেটেন্ট বিষয়ক আইন অনুযায়ী মোস্তফা জব্বার কোনোভাবেই ইউনিবিজয়ের তৈরিতে বাধা দিতে পারেন না। আবার ইউনিবিজয় লেআউটটি বিজয়ের হুবহু বা অবিকল না, বরং মোট আটটি বাটনের ক্ষেত্রে বিজয় আর ইউনিবিজয়ের পার্থক্য আছে। আর হ্যাকিং সম্পূর্ণভাবে সফটওয়ার বা ওয়েবসাইটের কোডিং ও ওয়েবসাইট যেখানে হোস্ট করা হয়েছে তার এ্যাডমিনদের ওপর নির্ভর করে। অভ্র শুধু বাংলা লেখার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, ওয়েবসাইটের কোডিং অথবা হোস্টিংয়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সুতরাং মোস্তফা জব্বারের বক্তব্য সঠিক নয়।’

এ প্রসঙ্গে কপিরাইট রেজিস্টার মঞ্জুরুর রহমান বলেন, ‘২০০৫-এর সংশোধিত কপিরাইট আইনের ২ নং ধারার ৮ (ঙ) তে বলা হয়েছে যে, কপিরাইটকৃত কোনো কম্পিউটার কর্মের সঙ্গে অন্য কোনো কর্মের সম্পূর্ণ বা আংশিক মিলে গেলে তা পাইরেসি হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের কাজে আংশিক মিলে যেতেই পারে। এটা কতখানি যৌক্তিক তা জানেন যারা আইন প্রণয়ন করেন তারা। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারি না। অভ্র-বিজয় বিতর্কের কথা আমরা শুনেছি। জনাব মোস্তফা জব্বার আমাদের কাছে অভিযোগ পাঠিয়েছেন। আমরা অভ্র’র মালিকের কাছে নোটিস পাঠিয়েছি। তার জবাবের ওপরই ফলাফল নির্ভর করছে।’

বিজয় এবং অভ্র’র পার্থক্য

  • ইউনিজয় ও বিজয়ে সাদৃশ্য থাকলেও এখানে অন্ততপক্ষে একটি কি পজিশনে ভ্যারিয়েশন রয়েছে। ফলে এরা সম্পূর্ণ আলাদা কী-বোর্ড।
  • বিজয় উইন্ডোজ ৯৫, ৯৮ ও সাপোর্ট করে, যা অভ্র করে না। সুতরাং অভ্র তার কোডিংয়ে কোনো কিছুই বিজয় থেকে ধার করেনি।
  • পুরনো বিজয়ে ইউনিকোড ফন্টগুলোর সাপোর্ট নেই। অভ্র শুরু থেকেই ইউনিকোডভিত্তিক।
  • অভ্রতে বিজয়ের একটি ফন্টও কাজ করে না। তাই অভ্র ফন্ট পাইরেসি থেকে মুক্ত। সে সর্বদাই ইউনিকোডভিত্তিক মুক্ত ফন্টের ওপর নির্ভরশীল।
  • অভ্রতে ঙ ং ঁ ৎ ঃ -এর কি স্ট্রোক ভিন্ন।
  • ে া – কার দিতে বিজয় এ দু’বার কি-চাপতে হয় কিন্তু অভ্রতে একবার এবং এটি অক্ষর লেখার পর চাপতে হয়।
  • ে – কার একইভাবে অক্ষর লেখার পর চাপতে হয়।
  • যুক্ত অক্ষর বিজয়ে লেখার পর ডিলিট করলে পুরো লেখা মুছে যায় কিন্তু অভ্র যুক্ত অক্ষরের প্রতিটি অক্ষরকে আলাদাভাবে মুছে থাকে। তাই ভুল হলেও দ্রুত সংশোধন করা যায়।
  • বিজয় দিয়ে টাইপ করলে ডকুমেন্টে ব্যাকরণ ভুল দেখায় কিন্তু অভ্রতে এ সমস্যা নেই।
  • অভ্র চালু করতে একটি মাত্র কী স্ট্রোক যথেষ্ট এবং ফন্ট ও ম্যানুয়ালি পাল্টাতে হয় না। এফ১২ চাপলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাষার সঙ্গে সঙ্গে ফন্টও পাল্টে যায়। বিজয় অনেক অনেক পেছনে পড়ে আছে এ দিক থেকে।
  • অভ্রের লিনাক্স ভার্সন রয়েছে কিন্তু বিজয় শুধুমাত্র ম্যাক ও উইন্ডোজে চলে।
  • অভ্র বিনামূল্যে ব্যবহার করা যায় কিন্তু বিজয় টাকা দিয়ে কিনতে হয়।
  • অভ্রতে নিজের কী-বোর্ড নিজেই তৈরি করে নেয়া যায় কিন্তু বিজয়ে এ ধরনের কোনো সুবিধা নেই।
  • বিজয় দিয়ে টাইপ করলে ওয়ার্ডে অনেক সময় বিভিন্ন অক্ষর বা শব্দ পরিবর্তিত হয়ে যায় অটোকারেক্ট ফিচারের জন্য কিন্তু অভ্রতে এ ধরনের সমস্যা নেই।
Advertisements
%d bloggers like this: