প্রসঙ্গ বিজয় কীবোর্ডের মেধাস্বত্ব – মোস্তাফা জব্বার

2010/05/24 at 12:06 পুর্বাহ্ন (বিভাগবিহীন)

সাপ্তাহিক পত্রিকার ৬ মে ২০১০ সংখ্যার ৩৯-৪১ পৃষ্ঠায় ‘অভ্র-বিজয় বিতর্ক – ব্যবসা নাকি সেবা?’ শিরোনামে আনিস রায়হানের একটি লেখা ছাপা হয়েছে। এই লেখাটির প্রেক্ষিতে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও জনপ্রিয় উপস্থাপক আব্দুন নূর তুষারের একটি লেখাও একই পত্রিকায় ১৩ মে ২০১০ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। জনাব আব্দুন নূর তুষারের লেখাটি অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এবং বিষয়ভিত্তিক। তার লেখা থেকে পাঠক-পাঠিকারা আনিস রায়হানের লেখার অনেক জবাব পেয়ে থাকবেন। আমি আব্দুন নূর তুষারকে ধন্যবাদ জানাই। যে সময়ে ইন্টারনেটের কয়েকটি বাংলা ব্লগিং সাইট, কিছু ফেসবুক ও মেইলে অশ্লীল, অরুচিকর, অযৌক্তিক, মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য দিয়ে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেই সময়ে জনাব তুষার একটি নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এজন্য জনাব তুষারকেও ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। সাপ্তাহিকের সাইটসহ বিভিন্ন ব্লগে মিথ্যা ও অরুচিকর মন্তব্যও করা হচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আমার অনুরোধ, বিজয় প্রসঙ্গে গালাগাল করতে হলে আমাকে করুন, অন্য কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করার চেষ্টা করবেন না, এটি অমানবিকও।

জনাব আনিস রায়হানের প্রচ্ছদ প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আমার প্রাথমিক মন্তব্য ও সার্বিক মূল্যায়ন হচ্ছে যে, তিনি জনাব মেহেদী হাসান খান এবং অভ্র’র প্রতি অনেকটা ঝুঁকে পড়ে প্রতিবেদনটিকে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ করেননি, যা সাপ্তাহিক-এর মতো পত্রিকার কাছে সকলে কাম্য। তিনি পুরো প্রতিবেদনটি জুড়ে আমার লেখাসমূহ থেকে অংশবিশেষ এমনভাবে তুলেছেন যাতে আমার একটি নেতিবাচক ইমেজ দাঁড়ায়। অথচ ইচ্ছে করলেই তিনি আমার সাক্ষাৎকার নিতে পারতেন।

প্রতিবেদনটি সম্পাদনা করার সময়ও বিষয়টি লক্ষ্য করা হয়নি। ৪১ পৃষ্ঠায় বিজয় ও অভ্র’র পার্থক্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে একতরফাভাবে অভ্র’র বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। একটি নিরপেক্ষ পত্রিকার পক্ষ থেকে এভাবে কোন পক্ষাবলম্বন করা উচিত নয়। প্রতিবেদনের শিরোনামটি থেকে লক্ষ্য করা যায় যে একটি তির্যক মনোভাব আমার মতো একজন ব্যবসায়ীর প্রতি ছিল-নইলে ব্যবসার সঙ্গে সেবার মহত্ত্ব তুলনীয় হতোনা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটি বলে যেটি আমার কাছে মনে হয়েছে সেটি হচ্ছে যে, প্রতিবেদনটিতে মেধাস্বত্ত্ব বা পুরা বিষয়টির মূল প্রসঙ্গ নিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। আসলে অভ্রর সঙ্গে বিজয়-এর কোনো বিতর্ক বা বিরোধ নেই। যেটি আছে সেটি হলো বিজয় কীবোর্ডের লেআউটের মেধাস্বত্ব নিয়ে। অথচ আমার ও কপিরাইট রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে আইনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেও প্রতিবেদক বিষয়টি একেবারেই এড়িয়ে গেছেন।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবেদক তার ভাষা ব্যবহারেও সংযত থাকেননি। আমাকে ‘কাবুলিওয়ালা’ তিনি নিজে কেন বললেন, তার কোন ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। আমি তাকেই বলতে বলব, ব্যবসা করলেই কি কেউ কাবুলিওয়ালা হয়? সাপ্তাহিক পত্রিকার পাঠকগণ যাতে প্রতিবেদনটির বিষয়ে নিরপেক্ষ মতামত গঠন করতে পারেন তার জন্য আমি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বক্তব্য দিতে চাই।

১। জনাব মেহেদী হাসান খান বলেছেন, “ব্যবসার অধিকার সবার আছে। যে কেউ চাইলে ব্যবসা করতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি বিনামূল্যে কাউকে কোন সেবা দিতে চান তাহলে সেখানে কারো বাধা দেবার অধিকার নেই বলে মনে করি।”

আমার বক্তব্য হচ্ছে, জনাব মেহেদী হাসান খানের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণভাবে একমত। এমনকি তার ফ্রি সফটওয়্যার বিতরণে কোন বাধা এলে আমি তার পাশে দাঁড়াতে রাজি আছি। কিন্তু তাকে আগেই বুঝতে হবে যে, তিনি তার অভ্র’তে ইউনিবিজয় নামে যে কীবোর্ড লেআউট অন্তর্ভুক্ত করেছেন সেটি তার সম্পদ নয়। এটি আমার সম্পদ। সেটি তিনি বিনামূল্যে বিতরণ করতে পারেন না। এছাড়াও তার ওয়েবসাইট থেকে বিজয় কীবোর্ড লেআউট যেভাবে বিতরণ করা হচ্ছে সেটিও যে মেধাস্বত্ব আইনের পরিপন্থী, সেটিও তাকে বুঝতে হবে।

আমি একেবারে স্পষ্ট করে বলেছি, আমার সম্পদ আমার অনুমতি ছাড়া তিনি বা অন্য কেউ তার সফটওয়্যারে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন না বা ব্যবহার করতে পারেন না। জনাব মেহেদী এটি স্বীকার করেন যে, বিজয় কীবোর্ড লেআউট আমার সম্পদ। তিনি দাবি করেন যে, আমার কীবোর্ড লেআআউট তিনি পরিবর্তন করেছেন। সেজন্যই তিনি তার ওয়েবসাইটে বলেছেন যে, ইউনিবিজয় জনপ্রিয় বিজয় কীবোর্ডের শতকরা ৯৯ ভাগ অনুরূপ। এটি সারাবিশ্বের মানুষ দেখেছে। আমিও তার ওয়েবসাইটে দেখেছি। অবশ্য গত ২১ মে ২০১০ থেকে আমি তার ওয়েবসাইটে সেটি আর দেখতে পাইনি। তবে এখনো তিনি বিজয়-এর নকল ইউনিবিজয় সংযুক্ত অবস্থায় অভ্র ৪.৫.১ সংস্করণ বিতরণ করছেন। শুধু তাই নয়, তার ওয়েবসাইট থেকে SamBijoy, Clonejoy, likebijoy এবং RRbijoy ইত্যাদি নামে আরো কয়েকটি কীবোর্ড লেআউট বিতরণ করা হয়। নাম থেকেই বোঝা যায়, এসব লেআউট বিজয়ের নকল। আমি জনাব মেহেদীর কাছে জানতে চাই, বিজয়ের নকল এসব কীবোর্ড লেআউট বিতরণ করার অধিকার তিনি কোন আইনে পেয়েছেন? জনাব মেহেদী আবেদন করেছেন এভাবে “আপনি আপনার সফটওয়্যার বিক্রি করেন। কিন্তু জনস্বার্থে লেআউটটি উন্মুক্ত করে দিতে পারেন।”

জনাব খানকে প্রশ্ন, আমি আপনার উন্মুক্ত করার আবেদন বিবেচনা করার আগেই আপনি কেন তা বিতরণ করা শুরু করলেন এবং দেশবাসীকে জানান সেটি কোন আইনের বলে করছেন।

মাননীয় প্রতিবেদক, অভ্র’র জনক ও সাপ্তাহিক পত্রিকার পাঠক-পাঠিকাদের জন্য আমি কপিরাইট আইন ২০০০ (২০০৫ সালে সংশোধিত) এর ২(৮)(ঙ) ধারাটি তুলে দিচ্ছি। এতে লেখা আছে, “কপিরাইট লঙ্ঘনকারী অনুলিপি হচ্ছে” “কম্পিউটার প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে কোন কম্পিউটার প্রোগ্রামের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষের পুনরুৎপাদন বা ব্যবহার” অন্য কোনো আইন বা অন্য কোনো ধারার কথা উল্লেখ না করেও এ কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, অভ্র বিজয় কীবোর্ডের সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক যে নকল সেই বিষয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। যারা মনে করেন যে, কীবোর্ডের একটি বা ৮টি বোতাম বদলালেই নতুন মৌলিক কীবোর্ড হবে- সেজন্য তাদেরকে আগে আইনটি বদলাতে হবে, পরে একথা বলতে হবে। নইলে বক্তব্যটি আইনানুগ হবে না। গায়ের জোরে মগের মুল্লুকে কথা বলা যেত-একটি সভ্য দেশে আইনকে অস্বীকার করে গায়ের জোরে কিছু বলা যায় না। সেজন্যই মেহেদী হাসান খানকে বিদ্যমান আইন মেনে তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্লগে-পত্রিকায় গালাগাল দিয়ে আইন বদলানো যাবে না, আইনটি সংসদে বদলাতে হবে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রতিবেদক আমার উদ্ধৃতি দিয়ে আইনের এই ধারাটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করলেও সেই ধারাটিতে যা বোঝানো হয় সেটি মাথায় নিয়ে কাজ করেননি। কপিরাইট রেজিস্ট্রারের উদ্ধৃতি হিসেবেও একই ধারার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবেদক সেই ধারাটির ব্যাখ্যা মনে রাখেননি।

২। বিজয় বনাম অভ্র : এবারে প্রতিবেদক বিজয় বনাম অভ্র’র যেসব পার্থক্য তুলে ধরেছেন তার কয়েকটি সম্পর্কে কিছু মন্তব্য করতে চাই।

  • ইউনিবিজয় ও বিজয় কীবোর্ড আলাদা নয়। কারণ বিজয় কীবোর্ড লেআউটের A থেকে Z পর্যন্ত সকল বোতামের সকল পজিশন হুবহু এক ও অভিন্ন। যে কটি পজিশন পরিবর্তন করা হয়েছে সেগুলো গৌণ ও স্বল্প। এছাড়া অভ্র’র সঙ্গে ব্যবহার করার জন্য বিজয়-এর অনুরূপ কীবোর্ডও বিতরণ করা হচ্ছে যাতে বস্তুত কোন পরিবর্তনই নেই। SamBijoy, Clonejoy, likebijoy এবং RRbijoy ইত্যাদি দেখুন। তা ছাড়া আলাদা হলেও এটি আইনের পরিপন্থী। কারণ এতে বিজয় কীবোর্ডের আংশিক পুনরুৎপাদন ও ব্যবহার করা হয়েছে।
  • বিজয় উইন্ডোজ ৯৫, ৯৮ সাপোর্ট করে। অভ্র করে না। কারণ বিজয় ১৯৮৮ সালে প্রথমে ম্যাকের জন্য ও পরে ১৯৯৩ সালে উইন্ডোজের জন্য বাজারে আসে। অভ্র শুধু ইউনিকোড সাপোর্ট করে, আসকি কোড সাপোর্ট করে না। এর অন্যতম কারণ, উইন্ডোজ ৯৫/৯৮ ইউনিকোড সাপোর্ট করে না। কিন্তু বিজয় ASCII এবং ইউনিকোড উভয়ই সাপোর্ট করে এবং এখন উইন্ডোজের সকল সংস্করণ সাপোর্ট করে। অভ্র’র সীমাবদ্ধতা আছে, বিজয়ের নেই। এটি পার্থক্য নয়, অভ্র’র অক্ষমতা। সেজন্য এটি সাপ্তাহিক পত্রিকাসহ প্রায় সকল কাগজের প্রকাশনা ব্যবহার করে না।
  • অভ্রে বিজয়ের একটি ফন্টও কাজ করে না, এটি ডাহা মিথ্যা কথা। বিজয়-এর যেসব ফন্টের নামের শেষে OMJ আছে এমন সকল ফন্ট অভ্র ব্যবহার করতে পারে। এই ফন্টগুলো ইউনিকোড সমর্থন করে। ইউনিকোড ওপেনটাইপ ব্যবহার করেÑ এর মানে এই নয় যে, এগুলো মুক্ত ফন্ট। এভাবে মুক্ত শব্দটির বাজে ব্যবহার না করা ভালো। বিজয়-এর সকল ইউনিকোড ফন্ট ওপেনটাইপÑতার মানে এগুলো বিনা লাইসেন্সে ব্যবহার করার জন্য নয়। এতে পার্থক্য কোথায়? প্রতিবেদককে অনুরোধ করব, তিনি যেন বিজয়-এর একুশে সংস্করণ দেখেন এবং বিস্মিত হন যে, এতে কীবোর্ড এডিটর রয়েছে। সবার জন্য এই কথাটি বলতে চাই যে, অভ্র মুক্ত সফটওয়্যার নয়, বিনামূল্যের সফটওয়্যার।

৩। জনাব মেহেদী হাসান খান তার বক্তব্যে অভ্র দিয়ে ভাষা উন্মুক্ত করার দাবি করেছেন। বিপ্লবের কথা বলেছেন। তিনি যদি বাংলা ভাষাকে উন্মুক্ত করে দিয়ে থাকেন তার জন্য পুরো বাঙালি জাতি তার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি তার এই কৃতিত্বকে খাটো করতে চাই না। কিন্তু এই মহৎ কাজে তিনি বিজয় কীবোর্ড যা আমার মতো একজন ‘ভাষা নিয়ে ব্যবসা করার’ লোকের সম্পদ, সেটি কেন ব্যবহার করছেন? তিনি যদি অভ্র দিয়ে বিশ্ব-মহাবিশ্ব জয় করেন আমরা তার পূজা করব- কিন্তু অন্যের সম্পদ নিয়ে বাহাদুরি করার মাঝে তাকে কোনো কৃতিত্ব আমি দিতে পারছি না। বরং এমন একটি বাজে কাজ এমন মহৎ মানুষের করা উচিত নয় বলেই আমি মনে করি।

প্রসঙ্গত, আমি সবিনয়ে এই কথাটি বলতে চাই যে, দুনিয়াতে বাংলা লেখার সম্পূর্ণ সমাধানের নাম বিজয়। ১৯৮৮ সাল থেকেই এটি চরম সত্য। কারণ বাংলাদেশসহ বিশ্বের কোটি মানুষ তাদের বাংলা লেখার চাহিদা বিজয় দিয়ে পূরণ করে থাকে। ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলা বর্ণমালা কম্পিউটারে লেখার যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছে তার নায়ক বিজয় – অন্য কেউ নয়। এটিও সত্য যে, বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় বাংলা কীবোর্ডের নাম বিজয়। যদি তা না হতো তাহলে পাইরেসির দায়ে কপিরাইট আইনের শাস্তির খড়গ মাথায় রেখে মেহেদী হাসান খান অভ্রতে তা অন্তর্ভুক্ত করত না এবং উন্মুক্ত করার আবেদনও জানাত না। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, অন্যের মেধাসম্পদ চুরি করে মহৎ হওয়াতে কোন কৃতিত্ব নেই, নিজেরটা দিয়ে মহৎ হোন।

ঢাকা, ২২ মে ২০১০
mustafajabbar@gamil.com

Advertisements
%d bloggers like this: